Translate

শহীদ বুদ্ধিজীবী ও সিরাজগঞ্জ মুক্ত দিবস উপলক্ষে বিএনসিপি সিরাজগঞ্জের মোমবাতি প্রজ্জ্বলন

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
আজ ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী ও সিরাজগঞ্জ মুক্ত দিবস। এই দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ ন্যাশনাল চাইল্ড পার্লামেন্ট (বিএনসিপি) সিরাজগঞ্জের উদ্যোগে শিশুর আলো ফাউন্ডেশন এর সহযোগীতায় সিরাজগঞ্জের মুক্তির সোপান শহীদ মিনারে সন্ধ্যায় মোমবাতি প্রজ্জ্বলিত করা হয়। 

এসময় উপস্থিত ছিলেন বিএনসিপি সিরাজগঞ্জের প্রেসিডেন্ট দীপংকর ভদ্র দীপ্ত, উপ প্রেসিডেন্ট বিএম আলভী আহমেদ, উপ মুখ্যমন্ত্রী কামাল পারভেজ তাহসিন, উপ স্পিকার বিজলী খাতুন টুম্পা, উপ অর্থ মন্ত্রী শাকিল আহমেদ, শিশু বার্তা পত্রিকার সম্পাদক ও কিশোর গোয়েন্দা প্রতিনিধি দ্বীন মোহম্মদ সাব্বির, সবুজ কানন স্কুল কমিটি আহ্বায়ক জিসান প্রমুখ। 

এসময় শহীদদের স্মরণে শহীদমিনারে প্রদীপ প্রজ্জলন করে বাংলাদেশ ন্যাশনাল চাইল্ড পার্লামেন্ট (বিএনসিপি) সিরাজগঞ্জ এর সদস্যগন। এবং কিছুক্ষন নিরবতা পালন করেন।

১৪ ডিসেম্বর, সিরাজগঞ্জ হানাদারমুক্ত দিবস। মুক্তিযুদ্ধের চুড়ান্ত বিজয় অর্জিত হওয়ার ঠিক আগ মুহুর্তে আজকের দিনে মুক্ত হয় সিরাজগঞ্জ শহর। এদিন সকাল ১০টায় বিজয়ের গর্বে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা তাদের প্রিয় শহরের দখল নেন। ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে উল্লাসে মেতে ওঠে বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধারা। মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি শহর ও শহরতলীর আশপাশ থেকে হাজার হাজার কৃষক-শ্রমিক-জনতা জাতীয় পতাকা হাতে শহরে প্রবেশ করে। বিজয় উল্লাসে মেতে ওঠে সিরাজগঞ্জবাসী।

গাজী জহরুল ইসলাম, গাজী আশরাফুল ইসলাম চৌধুরীসহ সিরাজগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধারা বলেন, ৭১’র ৯ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জ শহরকে হানাদারমুক্ত করার লক্ষ্যে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। প্রথমেই সদর উপজেলার খোকশাবাড়ী ইউনিয়নের শৈলাবাড়ী পাক বাহিনীর ক্যাম্প দখলের চেষ্টা করেন তারা। প্রচন্ড যুদ্ধে ওইদিন শহীদ হন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা সুলতান মাহমুদ। পাকবাহিনীর অত্যাধুনিক অস্ত্রের সাথে টিকে থাকতে না পেরে পিছু হটেন মুক্তিযোদ্ধারা। ক্লান্ত— মুক্তিযোদ্ধারা ১০ ডিসেম্বর বিশ্রাম নেন। ১১ ও ১২ ডিসেম্বর দফায় দফায় আক্রমণ চালাচ্ছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। ১৩ ডিসেম্বর থেকেই হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা সিরাজগঞ্জ শহরকে হানাদার মুক্ত করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। তিনদিক থেকে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। মোজাম্মেল হক ও ইসহাক আলীর নেতৃত্বে পূর্ব দিক থেকে, সোহরাব আলী ও লুৎফর রহমান দুদুর নেতৃত্বে পশ্চিম দিক থেকে, আমির হোসেন ভুলু ও জহুরুল ইসলামের নেতৃত্বে উত্তর দিক থেকে আক্রমণ করে। এছাড়াও দক্ষিণ দিক থেকে ইসমাইল হোসেন ও আব্দুল আজিজের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরোধ ব্যুহ গড়ে তোলেন। ওইদিন রাত তিনটা পর্যন্ত প্রচন্ড যুদ্ধ হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা কায়দায় সাড়াশি আক্রমণে টিকতে না পেরে পাক হানাদার বাহিনী ট্রেনযোগে ঈশ্বরদীর দিকে পালিয়ে যায়।
১৪ ডিসেম্বর ভোরে শহরের ওয়াপদা অফিসে পাকবাহিনীর মূল ক্যাম্প দখলে নেন মুক্তিযোদ্ধারা। ওইদিন কওমী জুটমিল, মহকুমা প্রশাসকের কার্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে উড়িয়ে দেয়া হয় জাতীয় পতাকা। সম্পূর্ণরুপে পাক হানাদার মুক্ত হয় সিরাজগঞ্জ। সিরাজগঞ্জ মুক্ত হবার পর মহুকুমা প্রশাসকের দায়িত্ব দেয়া হয় ইসমাইল হোসেনকে (বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী) এবং মুক্তিযুদ্ধে সিরাজগঞ্জে সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব দেয়া হয় মরহুম আমির হোসেন ভুলুকে।
জেলা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার গাজী সোহরাব আলী সরকার বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে সিরাজগঞ্জে সেদিন যারা মুক্তিযোদ্ধাদের এক কাতারে সমবেত ও সংগঠিত করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম মরহুম আমির হোসেন ভুলু, তৎকালীন মহুকুমা প্রশাসক (এসডিও) শহীদ শামসুদ্দিন, মরহুম আব্দুল লতিফ মির্জা, মরহুম গাজী লুৎফর রহমান অরুন, গাজী আমিনুল ইসলাম চৌধুরী, গাজী জহুরুল ইসলাম, আলাউদ্দিন সেখ, ইসমাইল হোসেন, ইসহাক আলী, আবু মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া, আব্দুল হাই তালুকদার, মরহুম এম এ রউফ পাতা, বিমল কুমার দাস, শফিকুল ইসলাম শফি, ফিরোজ ভুইয়া, মরহুম টিএম শামীম পান্না, মেজর মোজাফ্ফর, মরহুম মঞ্জুরুল হক তৌহিদ, আব্দুল বাছেদ খান, ফজলুল মতিন মুক্তা, সোহরাব আলী সরকার, ইসমাইল হোসেন প্রমূখ।
সিরাজগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার গাজী শফিকুল ইসলাম শফি জানান, ৯, ১১, ১২ ও ১৩ ডিসেম্বর চারদিনব্যাপী যুদ্ধ চলে। এ যুদ্ধে শহীদ হন ইঞ্জিনিয়ার আহসান হাবিব কালু, সুলতান মাহমুদসহ ৬জন বীর মুক্তিযোদ্ধা।
এর আগে ৭১ সালের এপ্রিল মাসে পাক হানাদার বাহিনী সিরাজগঞ্জ শহরে প্রবেশ করে বিভিন্ন জায়গায় ক্যাম্প স্থাপন করেই নানা রকম নির্যাতন জুলুম ধর্ষণ অগ্নিসংযোগে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করে সমগ্র শহর। নিষ্ঠুর ও জঘন্য পৈশাচিকতা ছড়িয়ে পড়ে শহরতলীসহ গ্রামীন জনপদেও। তিনি বলেন, ১৭ জুন’৭১ সিরাজগঞ্জের বেসরকারী সাব সেক্টর পলাশডাঙ্গা যুবশিবিরের নেতৃত্বে কামারখন্দ উপজেলার ভদ্রঘাটে প্রথম সম্মুখ যুদ্ধ সংগঠিত হয়। এর পর থেকে বাঘাবাড়ি, নওগাঁ, বরইতলী, বাগবাটি, ঘাটিনার ব্রীজ, ছোনগাছা, ভাটপিয়ারী, শৈলাবাড়ী, ব্রহ্মগাছা, ঝাঐলসহ বিভিন্ন স্থানে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। নিহত হয় সহস্রাধিক পাক হানাদার ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর এবং আলশাম্স বাহিনী।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে পরবর্তী ১ মাস তৎকালীন সিরাজগঞ্জ মহুকুমা ছিল হানাদার বাহিনী মুক্ত। এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহে পাকিস্তানী বাহিনী সিরাজগঞ্জে প্রবেশ করে। এ সময় মুক্তিযোদ্ধারা বাঘাবাড়ি, ঘাটিনা সহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিরোধ গড়ে তুলেও ব্যর্থ হয়। পরবর্তী মাসগুলো ছিল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গৌরবমাখা স্বর্ণোজ্জল অধ্যায়। এ সময় সিরাজগঞ্জের বড়ইতলী, বাগবাটি, ব্রম্মগাছা, নওগা, বারুহাস, কৈগাড়ি, ভদ্রঘাট বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে বিপুল সংখ্যক পাকসেনা নিহত হয়। ১২ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জ শহর থেকে খানিকটা উত্তরে শৈলাবাড়ি ও ছোনগাছায় বিপুল সংখ্যক মুক্তিবাহিনী সমবেত হয়। খবর পেয়ে পাক বাহিনীও সেখানে ছাউনি ফেলে। রাতেই মুক্তিবাহিনীরা হামলা চালায় শত্রু শিবিরে। এ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা সুলতান, সামাদ ও সোহরাব হোসেন শহীদ হন। রাতভর যুদ্ধ শেষে পরাজিত পাকবাহিনী গুলি ছুড়তে ছুড়তে শহরের দিকে পিছু হটে। এ সময় মুক্তিবাহিনীর বিপুল গেরিলা সদস্য শহরের উত্তর পশ্চিম ও পূর্ব দিক থেকে পাকসেনাদের অবরুদ্ধ করে রাখে। ১৩ ডিসেম্বর পাকবাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন ইঞ্জিনিয়ার আহসান হাবিব। এ যুদ্ধে পাকবাহিনী পরাজিত হয়ে রাতেই ট্রেনযোগে উল্লাপাড়া রেলষ্টেশন হয়ে নগরবাড়ির দিকে পালিয়ে যায়। ১৪ ডিসেম্বর সকালে মিত্র বাহিনীর বিমান সিরাজগঞ্জ জেলার উপরে টহল দেয়। পরিত্যাক্ত শত্রু শিবির লক্ষ্য করে বিমান থেকে গুলি ছোড়া হয়। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে মুক্তিযোদ্ধারা সিরাজগঞ্জ শহরে প্রবেশ করে। শহরের বি.এ কলেজ ক্যাম্পাসের শহীদ মিনারে উড়ায় স্বাধীন দেশের পতাকা। এরপর ঘরে ঘরে উত্তোলিত বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকা জাতীয় পতাকা।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ