Translate

সম্পাদকীয়।। ধর্ষনের শাস্তি বাল্য বিয়ে কেন?

ধর্ষনের শাস্তি বাল্য বিয়ে কেন?
সম্পাদকীয়....
বেশকিছুদিন হলো দেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে পরিচিত শিরোনাম গুলোর মধ্যে অন্যতম- “গ্রাম্য শালিসে ধর্ষকের কিছু পরিমান অর্থ জরিমানা” কিংবা “ধর্ষককে শাস্তি স্বরূপ ধরে বেধে বিয়ে দিয়ে দেওয়ার মত ঘটনাঅথবা সমাজের মানুষের মধ্যে একটি চিন্তাভাবনা কাজ করে ধর্ষককের সাথে বিয়ে দিয়ে দিলেই সঠিক বিচার হয়ে যাবে। কিন্তু এসব করে বিষয়টি আসলেই কি সমাধানের প্রান্তে পৌছতে পারে?

একটি শিশু ধর্ষণের স্বীকার হলেই কি তাকে ,শিশু বয়সে বিয়ে দিয়ে তার ধর্ষককে বৈধতা দিতে হবে। তাহলে কি একজন ধর্ষককের কাছে সোপে দেওয়া হবে যেন সেই মেয়ের জীবন। যেন সেই মেয়েটি তার স্বামির কাছে প্রতিনিয়ত অত্যাচার এবং বৈবাহিক ধর্ষণের স্বীকার হয়। নাকি মাত্র ১০ হাজার টাকা জমিমানা গ্রহণ করে তার সম্ভ্রম এর প্রতিদান দিতে হবে।

তাহলে কি সবাইকেই সহজভাবে আইনী বিচারের দারস্ত হবার জন্য সোস্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হতে হবে। আর শোরগোল না উঠলেই যেন গ্রাম্য মাতবরদের চা নাসতার মহৎসব বেঝে যাবে। আর সেই নাটকীয় বিচারের সমাধান আসবে বিয়ে, নয় সামান্য অর্থ দন্ড নতুবা হাত ধরে ক্ষমা চাওয়াআর এসবের জন্য লায় পেয়ে  যাচ্ছে, ক্ষমতার মগডালে বসে সেচ্ছাচারীতা করে বেড়ানো এই দুষ্ক্রিতিকারী মানুষগুলো।

বিবিসিতে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ছয়টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার প্রকাশিত শিশু বিষয়ক সংবাদ অনুযায়ী ২০১৮ তে পুরো বছরের তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সে বছর শিশুদের নিয়ে ১,০৩৭টি ইতিবাচক সংবাদের বিপরীতে নেতিবাচক সংবাদ ছিলো ২,৯৭৩টি। গবেষণামূলক আরও একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে ধর্ষণের শিকার হওয়ার মোট ৩৪৫টি সংবাদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা ৩৫৬, যার মধ্যে ধরষণ পরবরতী সময়ে মারা গেছে ২২ জন এবং আহত হয়েছে ৩৩৪ জন। প্রতিবেদনটিতে দেখা যায় শিশুরা বেশিরভাগ ধর্ষণের শিকার হয়েছে প্রতিবেশী, উত্যক্তকারী, বন্ধু, শিক্ষক, আত্মীয়-স্বজন বা অপরিচিত ব্যক্তির দ্বারাউত্যক্তকারী দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১১০ জন আর প্রতিবেশী দ্বারা ১০২ জন। গণধর্ষণের শিকার ৩৭ জন, শিক্ষক দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৭ জনসরকারি আইনি সহায়তার হালচাল বিশ্লেষণে নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনায় বিগত ১৬ বছরে সরকারের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার ৪ হাজার ৫৪১টি মামলা করেছে। এর মধ্যে ৬০টি ঘটনায় দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি হয়েছে।
তাহলে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, এই ৬০টি ঘটনার বিচার হলে বাকি ৪ হাজার ৪৮১টি মামলার কি হয়েছে? এ ঘটনাগুলোর প্রবাহ একই ভাবে হয়নি বা হতে দেওয়া হয়নি। ঘটনা প্রবাহ বাধাগ্রস্থ হবার পেছনে রয়েছে, সামাজিক পরিস্থিতি, ক্ষমতার অপপ্রয়োগ, হুমকি, মামলা চালানোর মত প্রয়োজনীয় অর্থের অভাব।

মুলত; একজন শিশুকে ধর্ষককের সাথে বিয়ে দিয়ে তার অপকরমকে বৈধতা না দিয়ে বরং আইনের মাধ্যমে যথোপুযুক্ত ভাবে ধর্ষককে এমন শাস্তী দেওয়া হোক যেন সমাজে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়। যেন একটি শিশুর সম্ভ্রমের বিনিময়ে কারো চা-নাসতার উৎসব না বেধে যায়। প্রতিটি মেয়ে শিশুর নিরাপদ ও সুন্দর জীবন নিশ্চিত করতে হলে ধরষণের মত জঘন্ন ঘটনাকে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না।
দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী, সেই নারীদের জীবনের চলার পথ যদি নিরাপদ না হয় অথবা একের পর এসব দুর্ঘটনার কারনে যদি নারিদের জীবন থমকে দাড়ায়। তাহলে সমাজ তথা পুরো দেশ পিছিয়ে পড়বে। কন্যা শিশু, কিশোরী ও নারীদের অনিরাপত্তার ফলে অনেকটা সমস্যার সম্মুখীন হবে “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের টেকশই উন্নয়ন লক্ষ মাত্রা” “এসডিজি ২০৩০” এর ৬ষ্ঠ লক্ষমাত্রা “নারীর ক্ষমতায়ন”
আর নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত না হলে পিছিয়ে পড়বে আধুনিক সমাজ, পিছিয়ে পড়বে দেশ এবং থমকে দাঁড়াবে দেশের উন্নয়নের গতি, পিছিয়ে পরব আমরা। তাই ধর্ষণ বিচারে বাল্যবিয়ে না দিয়ে বা সামান্য অর্থ জরিমানা করে অপরাধীকে প্রশ্রয় না দিয়ে, ধর্ষণ সহ প্রতিটি অপকর্মের উপযুক্ত বিচার ও সমাজ সচেতনার মাধ্যমে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে প্রতিটি ক্ষেত্রে নারিদের সমান ভাবে এগিয়ে নেয়ার ব্যাবস্থা করতে হবে।  

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ