Translate

"উপকূল দিবস" এখন উপকুলবাসীর প্রানের দাবি



সানজিদুল ইসলাম, ভোলাঃ
জলবায়ু পরিবর্তনে বিশ্বের সর্বাধিক  ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে বাংলাদেশ। এদেশের উপকূল প্রতিনিয়তই মোকাবেলা করছে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা। প্রতিটি ঘূর্ণিঝড় রেখে যাচ্ছে ধ্বংসের ছাপ। ১৯৭০ এর "ভোলা সাইক্লোন" তন্মধ্যে একটি। এর আগেও ১৮৭৬ সালে "বাকেরগঞ্জ সাইক্লোন" কেড়ে নেয় এদেশের 2 লক্ষ লোকের প্রা। তাদের মধ্যে এক লক্ষ মারা যায় দুর্ভিক্ষ, আর মহামারীতে। তারও আগে ১৫৮২ সালে বাকেরগঞ্জে আরেকটি ঘূর্ণিঝড়ের কথা জানা যায়, তাতেও ২ লক্ষ লোক মারা যায়। সত্তরের পরবর্তী ঘূর্ণিঝড় সমূহের মধ্যে ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ১ লক্ষ ৪০ হাজার লোক মারা যায়। ২০০৭ সালে সিডর, ২০০৮ সালের নার্গিস এবং ২০০৯ সালে আইলা যে  ধ্বংসের চিত্র রেখে গেছে তা ১০ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও কাটিয়ে উঠতে পারেনি উপকূলবাসী। তারপর ২০১৩ সালে মহাসেন, ২০১৬ এ রোয়ানু এবং সর্বশেষ এবছর সাম্প্রতিক সময়ের ঘূর্ণিঝড় ফণী ও ঘূর্ণিঝড় বুলবুল আমাদের চোখে দেখা এবং স্মৃতিতে এখনো ভাসমান।

তবে ৭০ এর ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতা অন্য কোন ঝড় এখন অতিক্রম করতে পারেনি।  এই প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড়টি "ভোলা সাইক্লোন" নামে পরিচিত। এটি দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রলয়ংকারী ঘূর্নিঝড় আর জলোচ্ছ্বাস এবং সর্বকালের সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাকৃতিক দুর্যোগসমূহের মধ্যে একটি। 

এটি গত ৮ নভেম্বর ২০১৯ বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হয়ে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উত্তর দিকে অগ্রসর হয় এবং ১১ নভেম্বর এর গতিবেগ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৮৫ কিলোমিটার ছাড়িয়ে সর্বোচ্চ গতিবেগে আছড়ে পড়ে বাংলাদেশের উপকূলে এবং চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় উপকূলের জনপদ। ১০.৬ মিটার উঁচু জলোচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে নিয়ে যায় বাংলাদেশের উপকূলের ৫ লক্ষাধিক মানুষকে। 

স্মৃতীর পাতা থেকে নেয়া তথ্য অনুযায়ী, 
১৯৭০ সালের ১১ নভেম্বর ছিল বুধবার। সারাদিন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হতে থাকে। পরদিন ১২ নভেম্বর বৃহস্পতিবার আবহাওয়া আরো খারাপ হতে থাকে এবং মধ্যরাত থেকেই ফুঁসে উঠতে থাকে সমুদ্র। তীব্র বেগে লোকালয়ের দিকে ধেয়ে এল পাহাড়সমান উঁচু ঢেউ। ৩০-৪০ ফুট উঁচু সেই ঢেউ আছড়ে পড়ে মানুষের ওপর। আর মুহূর্তেই ভাসিয়ে নিয়ে যায় মানুষ, গবাদিপশু, বাড়িঘর এবং খেতের ফসল। পথে-প্রান্তরে উন্মুক্ত আকাশের নিচে পড়ে ছিল কেবল লাশ আর লাশ। কত কুকুর, শিয়াল আর শকুন খেয়েছে সেই লাশ, তার কোনো ইয়ত্তা ছিলনা।

সেসময়ের ভোলার প্রবীণ রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহম্মেদ তার স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেন, "সকাল বেলা আমি এবং মোশারফ হোসেন শাহজাহান নদীর পাড়ে গিয়ে অবাক ও বিস্মিত হলাম। শুধু কাতারে কাতারে মানুষের মৃতদেহ। অসংখ্য লোকের মৃতদেহ আমাদের আতঙ্কিত করে তোলে। আমরা দিশাহারা হয়ে গেলাম। এখনো স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে শিবপুর ইউনিয়নে রতনপুর বাজারের পুকুর পাড়ে শত শত লোককে দাফন করার দৃশ্য! এত মৃতদেহ যে, দাফন করে আর কুলাতে পারছি না। যতদূর যাই শুধু মানুষের হাহাকার আর ক্রন্দন। এই শিবপুর ইউনিয়নে একটা বাড়ি যেখানে ৯০ জন লোক ছিল। কিন্তু বেঁচে ছিলেন মাত্র ৩ জন। সবাই মৃত্যুবরণ করেছে। যখন তজমুদ্দির খবর পাই তখন শুনি, ৪০% লোকের মৃত্যু হয়েছে।"

প্রলঙ্কারি এ ঘূর্ণিঝড়ে প্রান হারিয়েছিল উপকূলের ৫ লাখ মানুষ। তবে বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী,  সংখ্যাটি ১০ লাখ। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা ছিল ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলা, সেখানে ১৬৭০০০ জন অধিবাসীর মধ্যে ৭৭০০০ জনই (৪৬%) প্রাণ হারায়। এছাড়াও সেদিন ভোলা ছাড়াও উপকূলীয় হাতিয়া, রামগতি, চর আবদুল্লাহ, সন্দ্বীপ, বরগুনা, পটুয়াখালী ও চট্টগ্রামে ছিল ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের স্বাক্ষর।

১২ নভেম্বরের সেই বিভীষিকাময় স্মৃতি দিনকে আজও ভুলতে পারেনি উপকূলবাসী। সেই স্মৃতি আজও ব্যাথা দেয়  উপকূলবাসীর মনে। আর তাই উপকূলবাসীর প্রাণের দাবি ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ের স্মরণে ১২ ই নভেম্বর উপকূল দিবসটি বাস্তবায়ন করা হোক। যদি এ দিবসটি বাস্তবায়ন করা হয় তাহলে উপকূলের উন্নয়ন, সংকটের উত্তরণ, সম্ভাবনার বিকাশ, উপকূলের সকল অন্ধকার মোচন হবে সেইসাথে উপকূলে আসবে নতুন পরিবর্তন।
উপকূল দিবসের দাবিতে বাংলাদেশের উপকূল সন্ধানী সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম মন্টু বলেছেন, "দিবস তো কতই আছে! পাখি দিবস, পানি দিবস, শকুন দিবস, হাতি দিবস, শিক্ষা দিবস, স্বাস্থ্য দিবস, জনসংখ্যা দিবস, নারী দিবস, গ্রামীণ নারী দিবস, মানবাধিকার দিবস, ভালোবাসা দিবসসহ আরও কত দিবসের ভিড়ে আরেকটি দিবসের প্রস্তাব করছি শুধুমাত্র উপকূলের জন্যে। যে দিবস উপকূল সুরক্ষার কথা বলবে, উপকূলের সংকট-সম্ভাবনার কথা বলবে, উপকূলকে এগিয়ে নেওয়া কথা বলবে। যে দিবসে উপকূলবাসীর কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হবে। আর এভাবেই উপকূল এগিয়ে যাবে বিকাশের ধারায়।"
উপকূলবাসীর অগ্রগতি ও সুরক্ষার তাগিদে ১২ নভেম্বর উপকূল দিবস বাস্তবায়ন হোক এমনটাই প্রত্যাশা উপকূলবাসীদের।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ