Translate

অনেকদিন পরের কথা





মাহীব রেজা,ঢাকা

চকচকে স্টিলের তৈরি গোবেচারা ধরনের একটা রোবট রাশিকের ঘুম ভাঙালো। ঘুম থেকে ডাকার পদ্ধতিটাও দারুণ! কানের পেছনের নরম ত্বকে সুড়সুড়ি দিয়ে--যা আগেকার দিনের মানুষরা করত। এটা অবশ্য ঠিক  হাত দিয়ে ছুঁয়ে সুড়সুড়ি দেওয়ার মতো না, শুধু অনুভূতিটা জাগানো।
রোবটটাকে মানুষের মতো বানানোর চেষ্টা করা হয়েছে। নাকের ওপরে দুটো নীল বড় বড় চোখ কয়েক সেকেন্ড পরপর জ্বলছে আর নিভছে,ঠিক মানুষের চোখের পলক ফেলার মতো।
-সুপ্রভাত রাশিক। তোমার স্কুলে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। 
এটা বলেই রোবটটি তার নীল আলো জ্বলা চোখদুটো রাশিকের মুখের কাছে নিয়ে এলো। 
-ঠিক আছে, ঠিক আছে। আমি উঠেছি। তুমি কি আমাকে এক কাপ ধোঁয়াওঠা কফি দিতে পারো? কেমিক্যালি কফি বানাচ্ছে, সেগুলোই দিও।
-অবশ্যই রাশিক। এখন আর গাছের কফি কই পাবে?
রাশিক অনেকটা গোলাপি রঙের 'এন্টিমাইক্রোবিয়াল' দিয়ে দশ সেকেন্ডে দাঁত মেজে, স্কুলের পোশাক পরে ডাইনিং এ এসে পাউরুটি, কিছুটা এমিনো এসিডের টুকরো আর জেলি খেয়ে উঠতেই স্কুলের গাড়ির হর্ণ শোনা গেলো। সাথে সাথে ঘরে লাগানো সেন্সরটা বিকট শব্দে মনের ভেতর তাড়াহুড়া গোছের অনুভূতি বাড়িয়ে দিলো।
রোবটটা বুঝল না, এই আধুনিক যুগের মানুষেরা 'স্কুল' ব্যাপারটা কেনো এখনও রেখে দিয়েছে।ঘরে বসে সেই কবে থেকে মানুষ স্মার্টক্লাশ করা শুরু করেছে।আর এখন তো আরো সুবিধা! সুইচ টেপার ঝামেলা নেই, চোখের রেটিনাতে জিনের পরিবর্তন দেখেই ধরে নেওয়া যাচ্ছে কি বই পড়তে চাই আর চাইলে ব্যখ্যাও করে দিচ্ছে। এইসব ভেবে রোবটটা হতাশ ভঙ্গিতে তার নীল রঙের চোখ বন্ধ করে এনার্জি নেওয়া শুরু করল।
ক্লাশে আজকে ভিনগ্রহবাসীদের নিয়ে পড়ানো হচ্ছে।অনেককাল আগে নাকি মানুষ ভিনগ্রহীদের নিয়ে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। 'এলিয়েন' নাম দিয়ে তাদের নিয়ে নাকি সিনেমা পর্যন্ত বানিয়েছিল। রাশিক সে সময়টা কল্পনা করতে পারে।তার হাতে রাখা মেমোরি চিপ তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। সে জাদুঘরে দেখেছে- ইয়া বড় বড় এন্টেনা আর কয়েকশ টন ওজনের লম্বা রকেট বড় বড় ধোঁয়ার কুন্ডলি পাকিয়ে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। তখন মানুষের পকেটে 'স্মার্টফোন' নামের একটা জিনিস। ওটাতে আবার স্পর্শ করতে হয়। এখনকার মতো আঙুরের সমান হলোগ্রাফিক পাল্প ছিলো না।ভাবা যায়! সেসময় 'ফ্লাইং ডেকার' ছিলো না। মানুষ নাকি রাস্তায় চার চাকার গাড়ির ভেতর অনেকটা সময় কাটিয়ে দিতো। সেই সময়কার মরিয়া হয়ে ওঠা মানুষদের এতো বছর পর কেনো যে ভিনগ্রহীরা এখনও সাড়া দিলো না, কে জানে।
বাড়ি এসে রাশিক দেখে তার জন্য সব তৈরি করে রেখেছে রোবট। এমনকি সে ঘরে ঢোকার সাথে সাথে তাপমাত্রাও নিয়ন্ত্রণ করল সে।
সোফায় বসে রাশিক ভাবে, আগেরদিনে তার বয়সী স্কুলপড়ুয়ারা সবুজ মাঠে নানা কিছু খেলত। খোলা আকাশ ছিলো, সেখানে সাদা সাদা মেঘ তুলার মতো ভেসে বেড়াতো। বৃষ্টি হলে বৃষ্টিতে ভিজত ওরা। আর এখন, বৃষ্টি হলেই 'এসিড বৃষ্টি' হয়।গায়ে মোটা সিলিকন ফয়েল লাগিয়ে ঘুরতে হয়। এখনকার মতো সবখানে মুখের কাছে 'অক্সিজেন মাস্ক' নিয়ে বেড়াতে হতো না। অক্সিজেন ছিলো ফ্রী। চাপা কেমিকেলের গন্ধ ওঠা কৃত্রিম পানি পান করতে হতো না, নদী নালা ছিলো, কলকল করে পানি যেতো, রাশিক পুরনো সিনেমাগুলোতে দেখেছে ।এগুলো ভাবলে 'কেমনজানি' লাগে।
-রাশিকসোনা, আজকে আবহাওয়া দপ্তর আকাশের 'কৃত্রিম চাঁদ' টা বন্ধ রাখবে।
-ইশ! সত্যি? সত্যিকারের চাঁদ দেখা যাবে?
- সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারছি না সোনা। আকাশে এখন কার্বনের স্তর ১৭ সেমির কিছু নিচে। হয়ত চাঁদের সামান্য অংশও দেখতে পাবে না।
রাশিক বারান্দায় গেলো। অক্সিজেন মাস্কের  হুডটাতে লাগানো কাঁচ দিয়ে তাকালো ওপরে। চারদিকে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার।বাতাসে বিষাক্ত গ্যাস আর ধুলিকণার ছড়াছড়ি।সত্যিকারের চাঁদের এক ফোঁটা আলোও দেখা যায় না। শুধু শহরের স্পেস সেন্টার থেকে মঙ্গলগ্রহে পাঠানো সবুজ লেজার লাইটটা আলোপ্রভা ছড়াচ্ছে।
রাশিক জানে, গাছেরাই পারত এই অবস্থা থেকে মুক্ত করতে।'ফটোসিন্থেসিস'নামের এক আজব প্রক্রিয়ায় এরা অক্সিজেন বানাতে পারত। কিন্তু, সব গাছ শেষ হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে মানুষকে স্বস্তি দিতে হলোগ্রাফিক গাছের ছবি দিয়ে শহর সাজানো হয়েছে। 
রাশিক ভাবে, আহা রে! যদি আবার সেই টাচস্ক্রীন যুগে ফেরত যাওয়া যেতো, তাহলে অনেক গাছ লাগিয়ে দিতো। সত্যিকারের গাছ। হঠাৎই রোবটটা বলে উঠল-"আমিও যাবো, আমিও যাবো!" --কেনো কে জানে।  

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ